২০০৪ সালের পর দেশে দীর্ঘমেয়াদি বন্যা

দেশে জুনের শেষ দিকে ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে। প্লাবিত হয় গাইবান্ধা, জামালপুরের বিভিন্ন অঞ্চল। অন্য নদীর পানি বাড়তে থাকলে প্রায় একই সময় প্লাবিত হয় কুড়িগ্রাম, সিলেট ও সুনামগঞ্জ। তারপর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় টানা দেশের বিভিন্ন বন্যা বিরাজ করছে। বর্তমানে ১৫টি জেলা বন্যায় প্লাবিত। এবারের দীর্ঘমেয়াদি বন্যার মূল কারণ, বাংলাদেশ ও উজানে (বাংলাদেশ সংলগ্ন ভারত অংশে) ধাপে ধাপে ভারী বৃষ্টিপাত।

শনিবার (১৮ জুলাই) থেকে আরেক ধাপে ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে। ফলে বিদ্যমান বন্যার মাঝেই সাত-আট দিন আরও অবনতির দিকেই থাকবে বন্যা পরিস্থিতি। এমনকি এই বন্যা আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। এ রকম পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে, ২০০৪ সালের পর দেশে এত দীর্ঘসময় ধরে আর কখনও বন্যা ছিল না।

শনিবার বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, ‘২০০৪ সালে এ রকম দীর্ঘমেয়াদি বন্যা হয়েছিল। উল্লেখযোগ্য দীর্ঘমেয়াদি বন্যা হয়েছিল ১৯৯৮ ও ১৯৮৮ সালে। এরপর এত দীর্ঘমেয়াদি বন্যা ছিল না।’

এ বিষয়ে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. আল রাজি বলেন, ‘এর আগে যে বড় বড় বন্যা হয়েছে, সেগুলোতে আরও দীর্ঘ সময় ধরে বন্যা হয়েছে। যেমন ১৯৯৮ সালের বন্যা। ১৯৯৮ সালের বন্যা বর্তমানের চেয়ে আরও দীর্ঘ সময় ধরে ছিল। তবে বন্যাটা নেমে যাওয়ার পরে সুনির্দিষ্টভাবে এ বিষয়ে বলা যাবে।’

চলতি বন্যা দীর্ঘমেয়াদি হওয়ার কারণ তুলে ধরে মো. আল রাজি বলেন, ‘এবারের দীর্ঘমেয়াদি বন্যার মূল কারণ হলো মৌসুমি বৃষ্টিপাত। বৃষ্টি বারবার আসছে। আজ থেকে মৌসুমি বৃষ্টিপাতের আরেকটা ধাপ শুরু হয়েছে। বর্ষার কারণে নদনদীর পানি এমনিতেই বেশি আছে, তার সাথে এই বৃষ্টিপাতের ধাপগুলো বারবার আসার কারণে পানি বিপৎসীমার উপরে থাকছে। বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের উজান অববাহিকাগুলোয় ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে এই দীর্ঘমেয়াদি বন্যা।’

তিনি আরও বলেন, ‘ব্রহ্মপুত্রের পানি ২৭ জুন বিপৎসীমা অতিক্রম করে। এটা আট থেকে নয় দিন ছিল। সেটা নেমে যাওয়ার পর আবার শুরু হয়। আজ বৃষ্টিপাতের আরেকটা ফেজ শুরু হয়েছে। তবে নদীর পানি আজ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে। কাল পর্যন্ত হয়তো কমবে। এখন যে বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে, এটার কারণে পরশু থেকে হয়তো আবার পানি বাড়া শুরু করবে। তিন-চারদিন বাড়ার পর হয়তো আবার নামা শুরু করবে ধীরে ধীরে। এ হিসেবে ২৪-২৫ জুলাই পর্যন্ত দীর্ঘ সময় নদনদীর পানি বিপৎসীমার উপরেই থাকবে।’

‘বন্যা এই মাস পুরোটাই থাকবে। এমনও হতে পারে আগামী আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত বন্যা থাকতে পারে। এ বছর এরপরও বন্যা হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তবে এমন বড় ধরনের বন্যা হওয়ার সম্ভাবনা কম’- বলেন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া।

দীর্ঘমেয়াদি এ বন্যায় মানুষের দুর্ভোগ ছাড়া তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়নি বলে উল্লেখ করে আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, ‘সব খাতের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব আমরা নিই না। কৃষি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় আছে, তারা ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নেয়। তাছাড়া ক্ষয়ক্ষতির হিসাব এখনই দেয়া যাচ্ছে না। বন্যা পুরোপুরি চলে যাওয়ার পর তথ্যগুলো জোগাড় করে বুঝতে পারব। মানুষের দুর্ভোগ ছাড়া তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য ক্ষতি এখনও হয়নি। মানুষের দুর্ভোগটা একটু বেশি হবে এই আর কী। কৃষিকাজের বেশ ক্ষতি হবে। তবে অবকাঠামোগত বড় ধরনের ক্ষতির খবর এখনও আমাদের কাছে আসেনি।’

তিনি আরও বলেন, ‘উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে একটু বেশি ক্ষতি হবে। উত্তরাঞ্চলের তুলনায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলে একটু কম ক্ষয়ক্ষতি হবে। মধ্যাঞ্চলের দিকেও কিছুটা ক্ষতি হতে পারে। সামনের দিনগুলোতে উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।’

আগামী ২৪ ঘণ্টায় সিলেট, সুনামগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া, জামালপুর, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও মানিকগঞ্জ জেলার বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। অন্যদিকে মুন্সিগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, রাজবাড়ী ও ঢাকা জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকতে পারে।

তারা আরও বলছে, ব্রহ্মপুত্র-যমুনার পানি কমছে, যা আগামী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানি স্থিতিশীল আছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় পদ্মার পানি কমা শুরু হতে পারে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উজান মেঘনা অববাহিকার প্রধান নদীগুলোর পানি কমছে, যা আগামী ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় পুরোনো ব্রহ্মপুত্র নদী জামালপুর পয়েন্টে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে।

শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে শনিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত সময়ে ১০১টি পর্যবেক্ষণাধীন পানি স্টেশনের মধ্যে পানি বেড়েছে ৪১টিতে, কমেছে ৫৯টিতে এবং অপরিবর্তিত রয়েছে একটিতে। তাছাড়া স্টেশনগুলোর মধ্যে বিপৎসীমার উপরে রয়েছে ২২টির পানি।

বিপৎসীমার উপরে থাকা স্টেশনগুলোর মধ্যে ধরলা নদীর কুড়িগ্রাম অংশে বিপৎসীমার ৪৫ সেন্টিমিটার উপরে, ঘাঘটের গাইবান্ধা অংশে ৭২, করতোয়ার চকরহিমপুর অংশে ১২, ব্রহ্মপুত্রের নুনখাওয়া অংশে ৫৫, ব্রহ্মপুত্রের চিলমারী অংশে ৭০, যমুনার ফুলছড়ি অংশে ১০২, যমুনার বাহাদুরাবাদ অংশে ১১১, যমুনার সারিয়াকান্দি অংশে ১১৭, যমুনার কাজীপুর অংশে ১০৪, যমুনার সিরাজগঞ্জ অংশে ৯৬, যমুনার আরিচা অংশে ৭২, সিংড়া অংশে ৫০, আত্রাইয়ের বাঘাবাড়ী অংশে ১০০, ধলেশ্বরীর এলাসিন অংশে ১০৬, কালিগঙ্গার তারাঘাট অংশে ২৯, পদ্মার গোলায়ন্দ অংশে ১০৬, পদ্মার ভাগ্যকূল অংশে ৫৯, পদ্মার মাওয়ার অংশে ৫৫, সুরমার কানাইঘাট অংশে ২৬, কুশিয়ারার অমলসিদ অংশে ৩৪, কুশিয়ারার শেওলা অংশে ১৩ এবং পুরোনো সুরমার দিরাই অংশে বিপৎসীমার ৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।

শেয়ার করুন