
বাংলাদেশে সাংবাদিকতা পেশা দীর্ঘদিন ধরে গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা ও জনস্বার্থ রক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে “সাংবাদিক” পরিচয়কে ব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল, ভয়ভীতি প্রদর্শন, ব্ল্যাকমেইল, চাঁদাবাজি কিংবা প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও অনিবন্ধিত তথাকথিত মিডিয়ার বিস্তারের ফলে এই প্রবণতা আরও জটিল আকার নিয়েছে।
মিডিয়া বিশ্লেষকরা এই প্রবণতাকে অনানুষ্ঠানিকভাবে “স্যান্ডউইচ সাংবাদিকতা” নামে আখ্যা দিচ্ছেন—যেখানে একজন ব্যক্তি পরিস্থিতি অনুযায়ী সাংবাদিক পরিচয়কে ভিন্ন ভিন্ন স্তরে ব্যবহার করেন, ঠিক একটি স্যান্ডউইচের স্তরের মতো।
গবেষক ও মিডিয়া পর্যবেক্ষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি এমন এক আচরণগত কৌশল যেখানে—
ব্যক্তি নিজেকে মূলধারার বা পেশাদার গণমাধ্যমের সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দেন।
এতে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, প্রশাসনিক প্রবেশাধিকার ও জনআস্থা তৈরি হয়।
পরবর্তীতে সেই পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে—কিছু ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার হয়:
যখন আইনি জটিলতা বা সমালোচনা তৈরি হয়, তখন আবার “পেশাদার সাংবাদিক” পরিচয় সামনে আনা হয় এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার আড়ালে আত্মরক্ষার চেষ্টা করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতা প্রকৃত সাংবাদিকতা ও অপসাংবাদিকতার সীমারেখাকে ঝাপসা করে দিচ্ছে।
গণমাধ্যম বিশ্লেষকরা কয়েকটি কারণকে দায়ী করছেন—
অল্প খরচে অনলাইন পোর্টাল খোলা সম্ভব হওয়ায় অনেকেই সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করছেন পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ বা নৈতিকতা ছাড়াই।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে সাংবাদিক পরিচয় প্রশাসনিক ও সামাজিকভাবে বিশেষ প্রভাব তৈরি করে।
অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া পরিচয়ধারীরা দীর্ঘদিন পার পেয়ে যান।
ফেসবুক লাইভ, ইউটিউব “স্টিং”, বা আংশিক তথ্য প্রকাশ করে চাপ সৃষ্টি করার প্রবণতাও বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, “স্যান্ডউইচ সাংবাদিকতা” সবচেয়ে বড় ক্ষতি করছে পেশাদার সাংবাদিকদের।
জনগণের একটি অংশ এখন সাংবাদিকদের প্রতিও সন্দেহপ্রবণ হয়ে উঠছে।
অনেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা প্রকৃত সাংবাদিকদেরও অবিশ্বাস করতে শুরু করেছেন।
অপসাংবাদিকতার কারণে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ কখনও কখনও প্রকৃত সাংবাদিকদের ওপরও পড়ে।
যখন ব্ল্যাকমেইলকে “অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তখন প্রকৃত অনুসন্ধানী কাজের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়।
সাংবাদিকতার ওপর আস্থা কমে গেলে জবাবদিহিতাও দুর্বল হয়।
কারণ মানুষ সত্যিকারের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনকেও সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে।
ভুয়া পরিচয়ে প্রভাব খাটানো প্রশাসনিক স্বচ্ছতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
একজনের অপকর্ম পুরো পেশার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
গণমাধ্যম নৈতিকতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন গবেষণায় সাংবাদিক পরিচয়ের অপব্যবহারকে গুরুতর হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তাদের বিখ্যাত গ্রন্থ The Elements of Journalism-এ সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি হিসেবে “জনস্বার্থ” ও “সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা”-র কথা বলা হয়েছে। ব্যক্তিগত স্বার্থে সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহারের প্রবণতা এই নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত।
Public Opinion বইয়ে তিনি দেখিয়েছেন, সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হলে জনগণের বাস্তবতা বোঝার ক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়কে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য বড় হুমকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানে সাংবাদিকদের “Avoid conflicts of interest” এবং “Act independently” নীতির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
মিডিয়া সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে,
“সাংবাদিকতা কখনোই ব্যক্তিগত অস্ত্র হতে পারে না। সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যদি ভয়ভীতি, অর্থ আদায় বা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন, তাহলে তা শুধু অনৈতিক নয়—এটি পুরো গণমাধ্যম ব্যবস্থার জন্য বিপজ্জনক।”
“স্যান্ডউইচ সাংবাদিকতা” কেবল একটি ব্যঙ্গাত্মক শব্দ নয়; এটি সাংবাদিক পরিচয়ের আড়ালে গড়ে ওঠা এক বিপজ্জনক সামাজিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। যখন সাংবাদিকতা জনস্বার্থের বদলে ব্যক্তিস্বার্থের হাতিয়ার হয়ে যায়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একটি পেশা নয়—পুরো সমাজ, রাষ্ট্র ও গণতান্ত্রিক কাঠামো।
প্রকৃত সাংবাদিকতা সত্য, জবাবদিহিতা ও জনকল্যাণের জন্য। আর সেই জায়গাটি রক্ষা করতে হলে সাংবাদিক পরিচয়ের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি।